বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এবং রোমান্টিক ধাঁচের চলচ্চিত্র “ভুবন মাঝি”

বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত, ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এবং রোমান্টিক ধাঁচের চলচ্চিত্র “ভুবন মাঝি”। এতে অভিনয় করেছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা ঘোষ, মাজনুন মিজান, মামুনুর রশিদ,কাজী নওশাবা, সুমিত সেন সহ আরও অনেকে।

সঙ্গীত পরিচালনা করেন, কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। ছবিটি মুক্তির ৪দিন পর ই তিনি মারা যান। ছবিটি তাঁকে উৎসর্গ করা হয়। নন লিনিয়ার স্টোরি টেলিং এর এই সিনেমায় মোট ৩ টি টাইমলাইন এ ৩টি ভিন্ন সময়ের যথা ১৯৭১, ২০০৩ এবং ২০১৩ সালের গল্প প্যারালাল ভাবে বলা হয়। শেষে গিয়ে নাটকীয় ভাবে যুক্ত হয় গল্প ৩টি।

১৯৭১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ইতিহাস ও প্রেম, বিদ্রোহ ও সংস্কৃতি এসবই উঠে এসেছে চলচ্চিত্র এ। আধুনিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র গুলোর মধ্যে বেশ দারুণ একটি চলচ্চিত্র এটি। আমার পছন্দের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে এটি।

  • স্পয়লার নেই
  • ভুবন মাঝি (২০১৭)
  • পরিচালক – ফাখরুল আরেফিন খান

চলচ্চিত্রে আলাদা আলাদা টাইমলাইনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু বিষয় যেমন – ৩রা মার্চ জাতীয়া পতাকা উত্তোলন, গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষনা, মেহেরপুর এ সরকার গঠন, ভারতের বিহারে বাঙ্গালীদের অস্ত্র ও যুদ্ধ কৌশল প্রশিক্ষণ, রাজাকারদের কর্মকাণ্ড।

এবং সেই সাথে একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প যে কিনা মরতে ভয় পায় আবার মানুষ মারতেও ভয় পায়। এরই সাথে দেখানো হয়েছে সুন্দর একটি প্রেমের গল্প।আর ২০০৩ ও ২০১৩ এর টাইমলাইন এ দেখানো হয়েছে যথাক্রমে দু’জন ছেলেমেয়ের মধ্যকার প্রেমের সম্পর্ক ও তাদের একটি ডকুমেন্টারি বানাতে কুষ্টিয়া যাওয়া;

এবং সদ্য প্রয়াত একজন বাউল সাধক এর মৃত্যুর পর জানাজা না দেয়া নিয়ে গ্রামবাসীদের কর্মকান্ডই। কিভাবে শেষে এসে এই গল্প গুলোই একসাথে জোড়া লাগে সেটাই দেখার বিষয়।

রাজাকারদের কর্মকাণ্ড

এই চলচ্চিত্রের বড় অংশই সাজানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী কুষ্টিয়া,মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার কিছু মানুষের গল্প নিয়ে। পুরো দৃশ্যায়ন ও হয়েছে সেখানে, ঢাকায় এবং কিছু অংশ কলকাতায়।এছাড়াও চলচ্চিত্রে বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রিয়েল ফুটেজ ব্যবহার হয়েছে।

পরমব্রত এর অভিনয় ভালোই ছিলো, তবে পুরোপুরি বাঙ্গালি একসেন্ট এ কথা বলতে পারলে আরও ভালো হত। অপর্না ও দারুণ করেছে।ওনাকে আরও বেশি করে চলচ্চিত্রে কাজে লাগানো উচিত। পরমব্রত এর পাশে মাজনুন মিজান কে কিছুটা কম মনে হলেও তাও চালিয়ে নেয়ার মত।

বড় হুজুর চরিত্রে মামুনুর রশিদ আর রাজাকার চরিত্রে (নামটা মনে করতে পারছি না) লোকটা স্ক্রিনটাইম কম হলেও ভালোই করেছেন। (মামুনুর রশিদ আর তার সাগরেদ এর দাঁড়িটা খুবই দৃষ্টিকটু ছিলো)

চলচ্চিত্রের সবথেকে জোস জিনিসটা হলো এর সিনেমাটোগ্রাফি আর মিউজিক। এর প্রতিটা ফ্রেম এতো সুন্দর, কিছু কিছু ফ্রেম আমি জাস্ট পজ করে করে তাকিয়ে ছিলাম। স্ক্রিনশট নিচ্ছিলাম।

(নিচে শেয়ার করলাম বেশ কিছু)।আর সেই সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ক্ষনিক পরপর বেজে ওঠা জাতীয় সংগীত আর দেশাত্মবোধক গানগুলোর ইনস্ট্রুমেন্টাল ভার্সন আর কালিকাপ্রসাদ এর কম্পোজিশন এ গানগুলো। কিছু গান তো এখনো মাথায় ঘুরে।বিশেষ করে সপ্তর্ষির কন্ঠে “আমি তোমারই নাম গাই” তো আগে থেকেই খুব পছন্দের।সাথে পরমব্রত এর গাওয়া গানটাও দারুণ ছিলো।

কালার গ্রেডিং ও বেশ চমৎকার

প্রতিটা টাইমলাইন আলাদা আলাদা কালার, নাইট সিনগুলোর কালার সহ সবকিছুতেই তৃপ্তি পেলাম। চোখের শান্তি। সরকারি অনুদানে নির্মিত ছবি গুলোর প্রোডাকশন এতো জোস হতে পারে ভাবিনি, যেখানে অনেক পরিচালক অনুদানের টাকায় ছবি শেষ করতেই হিমশিম খায়।

এতভালো বাংলা ছবিতে মেকিং রিসেন্ট সময়ে খুব দেখেছি। আর এই টাইপ ননলিনিয়ার স্টোরিটেলিং ও বাংলা ছবিতে খুব একটা দেখা যায় না।
সবমিলিয়ে কিছু ছোটোখাটো মিস্টেক বাদে সব মিলিয়ে দারুন উপভোগ্য একটা ছবি। দেখে নিতে পারেন 💙

রিডলি স্কডের পরিচালনায় এই ফিল্ম ১২ শতকের ক্রুসেড যুদ্ধের পটভূমি নিয়ে নির্মিত। হিস্ট্রি ফিল্মগুলো যারা পছন্দ করেন তাদের জন্যে মাস্টওয়াচ এক ফিল্ম। যুদ্ধকে জীবন্তের মতো ফুটিয়ে তোলা এ ফিল্ম নিঃসন্দেহে রিডলি স্কডের সেরা কাজের মধ্যে অন্যতম।

হালকা স্পয়লার

কাহিনী সংক্ষেপ: জেরুজালেম, একই সাথে মুসলমান,খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের জন্যে পবিত্র স্থান। শান্তির এ স্থানে কিন্তু বেশ অশান্তি নানা সময়ে সংঘটিত হয়েছে। হয়েছে বারেবারে রক্তক্ষরণ। এমনই ১২শতকের ক্রুসেড যুদ্ধে মুসলিম সুলতান সালাউদ্দিনের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় খ্রিস্টানরা।

হিস্ট্রি নিয়ে ফিল্ম হলে প্রথম প্রশ্ন আসে গল্প কতোটা এক্যুরেট। রিডলি স্কড হতাশ করেনি। দারুন ডিরেকশন, গ্রাফিক্সের কাজ এবং বিশাল যুদ্ধের চিত্রায়ণ সত্যিই অবাক করার মতো। অতিরঞ্জিত কিছু নেই। শান্তির এই স্থানের অশান্তির এ ইতিহাস নিয়ে বানানো এ ফিল্মের আরেকটি বিষয়ও দারুণ লেগেছে, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

সালাউদ্দিনের চরিত্রকে নেতিবাচক করে দেখায়নি এজন্যে রিডলি স্কড একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। ব্যক্তিগত রেটিং: ৯.৫/১০

Leave a Reply